সুনামগঞ্জে প্রবাসীর স্ত্রী হত্যা...
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্নাকে হত্যার দায়ে জিতেশ চন্দ্র গোপ নামের এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে...
প্রশাসনের অভিযান-মামলায় শ্রমিক ও প্রতিবাদকারীরা আসামি—প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের গুরুতর অভিযোগ
সংগৃহীত
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীরা নিজেদের নিরাপদ রেখে নদীতে বালু লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এসবের প্রতিবাদকারীদের পাশাপাশি নিরীহ স্থানীয় বাসিন্দাদেরও মামলায় জড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। ফলে প্রশাসনের অভিযান ও দায়ের করা মামলার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, প্রতিবাদ ও আন্দোলনকারীদেরই অনেক ক্ষেত্রে মামলার আসামি করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত বালু উত্তোলনকারীরা আড়ালে থেকে আবারও নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রশাসনের অভিযানে মাঝে মধ্যে কয়েকটি ছোট নৌকা জব্দ এবং নিম্ন আয়ের কয়েকজন শ্রমিক আটক হলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বালু উত্তোলনের অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বর চেলা নদীর সোনাপুর-পূর্ব-সোনাপুর (মরা চেলা) এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া বেআইনিভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। দোয়ারাবাজার থানায় মামলাটি দায়ের করেন পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. মুহাইমিনুল হক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে সোনাপুর ও পূর্ব-সোনাপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
তবে মামলায় আসামি হওয়া কয়েকজনের দাবি, তারা বালু উত্তোলনের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত বালু উত্তোলনকারীদের আড়াল করতেই নিরপরাধ ও প্রতিবাদকারীদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্ত সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি একটি মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষক। পাশাপাশি ইছামতী বাজারে তার একটি ফার্মেসি রয়েছে। শিক্ষকতার বাইরে অতিরিক্ত সময় দুই সন্তানকে নিয়ে ফার্মেসির ব্যবসায় সহযোগিতা করেন। নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে তার বা তার পরিবারের কারও কোনো সম্পর্ক নেই। এরপরও তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা জহুর মিয়া বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় অধিকাংশ আসামিই নিরপরাধ। শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিসহ অনেককে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিরীহ ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত বালু লুটেরাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী থেকে উত্তোলিত বালু কয়েক কিলোমিটার দূরে বিভিন্ন বাল্কহেড ও ডাম্পিং পয়েন্টে নিয়ে মজুত করা হচ্ছে। এসব স্থানে বিপুল পরিমাণ বালু স্তূপ করে রাখা হলেও সেখানে কার্যকর অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের পরিবর্তে শুধু শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, সোনাপুর ও পূর্ব-সোনাপুর এলাকায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদধারী ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের খবর অনেক সময় আগেই বালু উত্তোলনকারীদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে মূলহোতারা নিরাপদে সরে পড়লেও ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকরা অভিযানে আটক হন। কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর আবারও আগের মতো বালু উত্তোলন শুরু হয় বলে অভিযোগ তাদের।
তাদের দাবি, শুধু শ্রমিকদের আটক বা ছোট নৌকা জব্দ করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়। নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রক, পরিবহনকারী ও ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা বালু জব্দের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মুহাইমিনুল হক জানান, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শন করেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। এজাহারের বাইরে থাকা বালু লুটেরাদের নাম তদন্ত শেষে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
টিএ/ছাতক