রোহিঙ্গা সংকট:

বাংলাদেশ আর কতদিন এই বোঝা বহন করবে?

post-title

সংগৃহিত

 কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন আর কোনো অস্থায়ী মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র নয়। প্রায় এক দশক ধরে লাখ লাখ মানুষ সেখানে বসবাস করছে। যে সংকটকে শুরুতে সাময়িক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা এখন বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো—আর কতদিন?

আর কতদিন কক্সবাজারের মানুষ একটি অন্য দেশের তৈরি সংকটের মূল্য বহন করবে? আর কতদিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তার অঙ্ক কমিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ও সংকটের গভীরতা একই সঙ্গে বাড়তে দেখবে? আর কতদিন প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি থাকবে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিবেশ তৈরি হবে না?

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোই নতুন করে সামনে এনেছে।

বাংলাদেশের বার্তাটি এবার আরও স্পষ্ট: রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনা করে অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে নেওয়া যাবে না; সংকটের মূল কারণের সমাধান করতে হবে।

আশ্রয় দেওয়া সমাধান নয়

বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। সীমান্ত খুলেছে, ক্যাম্প তৈরি করেছে, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে।

কিন্তু আশ্রয় দেওয়া আর স্থায়ী সমাধান—দুটি এক জিনিস নয়।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে—এমন কোনো সমাধান বাংলাদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও এই সংকটকে বছরের পর বছর ‘মানবিক সহায়তা’ দিয়ে পরিচালনা করে যাওয়াই যথেষ্ট হওয়া উচিত নয়।

কারণ এতে সমস্যার উপসর্গ সামাল দেওয়া হয়; সমস্যার কারণ অমীমাংসিতই থেকে যায়।প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে তাই যে কথাটি বলেছেন, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ: “The crisis originated in Myanmar. Its solution lies in Myanmar.”

সংকটের জন্ম যেখানে, স্থায়ী সমাধানও সেখানেই হতে হবে।

প্রত্যাবাসন—কিন্তু কেমন প্রত্যাবাসন?

রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে হবে—এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। কিন্তু শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়।

প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই।

এই চারটি শব্দের প্রতিটির বাস্তব অর্থ আছে।

ফিরে গিয়ে যদি আবারও সহিংসতার শিকার হতে হয়, নাগরিক ও মৌলিক অধিকার না থাকে, চলাচলের স্বাধীনতা না থাকে কিংবা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকে—তাহলে সেই প্রত্যাবাসন কতটা টেকসই হবে, সেটিই মৌলিক প্রশ্ন।

তাই প্রত্যাবাসনের আগে মিয়ানমারে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়। বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

এখানেই এতদিনের কূটনৈতিক ব্যর্থতার বড় প্রশ্নটি সামনে আসে: প্রত্যাবাসনের কথা বহুবার বলা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাবাসনযোগ্য পরিবেশ তৈরির জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ কতটা তৈরি হয়েছে?

পাঁচ দফা প্রস্তাবের গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী যে পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু দাবি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ সংকট-সমাধান কাঠামোর পাঁচটি স্তম্ভ।

প্রথমত, দরকার বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ।

শুধু তালিকা তৈরি, বৈঠক করা কিংবা বিবৃতি দেওয়া যথেষ্ট নয়। কবে, কীভাবে, কোন নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে এবং কী অধিকার নিয়ে রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে—তার বাস্তব উত্তর প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, দরকার মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার নিশ্চিত করা।

রোহিঙ্গারা ফিরে গিয়ে কী অবস্থায় থাকবেন, সেটিই প্রত্যাবাসনের গ্রহণযোগ্যতার মূল পরীক্ষা।

তৃতীয়ত, দরকার মানবিক অর্থায়ন অব্যাহত রাখা।

এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একদিকে বলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে সেই সহায়তার অর্থায়ন কমছে।

২০২৬ সালের জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জন্য প্রয়োজন ছিল ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সংকট শেষ হয়নি, কিন্তু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে—এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

সংকটের সমাধান না করে অর্থ কমিয়ে দেওয়া হলে তার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চাপ পড়বে ক্যাম্পের মানুষ এবং তাঁদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর।

চতুর্থত, দরকার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি।

যে অপরাধের কারণে মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, পরিবার হারিয়েছে, দেশছাড়া হয়েছে—সেসব অপরাধের জবাবদিহি ছাড়া স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

পঞ্চমত, দরকার আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতা।

মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সঙ্গে বাড়তে পারে। কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান এই ঝুঁকিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

কক্সবাজার কি শুধু সহ্য করবে?

রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত পক্ষগুলোর একটি হলো কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষ।

তাঁরা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁদের জমি, পরিবেশ, অবকাঠামো, শ্রমবাজার ও স্থানীয় সেবাব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তার বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গাদের জরুরি প্রয়োজনের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন তাই অযৌক্তিক নয়:

আমাদের ক্ষতির হিসাব কোথায়?

রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বার্থও উপেক্ষা করা যায় না।

মানবিক সহায়তা শুধু ক্যাম্পের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সহায়তা কমলে ঝুঁকি বাড়বে

রোহিঙ্গা সংকটের অর্থায়ন কমে যাওয়া শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয়। এটি নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।

খাদ্য ও জীবিকার সুযোগ কমে গেলে ক্যাম্পের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি তৈরি হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হলে অপরাধী চক্র ও পাচারকারীদের প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাই মানবিক অর্থায়নকে দাতাদের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, পূর্বানুমানযোগ্য এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ একা আর কতদিন?

এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু একটি দেশের সামর্থ্যেরও সীমা আছে।

বাংলাদেশ কোনো সংঘাত সৃষ্টি করেনি। রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করার কারণও বাংলাদেশ নয়। অথচ সংকটের সবচেয়ে বড় মানবিক ও ভৌগোলিক চাপ বহন করছে বাংলাদেশই।

এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা দরকার।

বাংলাদেশের বার্তা হওয়া উচিত স্পষ্ট:

মানবিক দায়িত্ব বাংলাদেশ পালন করবে, কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধানের রাজনৈতিক দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও নিতে হবে।

আর সেই দায়িত্বের কেন্দ্রে থাকতে হবে মিয়ানমার।

শুধু প্রত্যাবাসন নয়, নিরাপদ প্রত্যাবাসন

রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক সরলীকরণ হলো—‘তাদের ফিরিয়ে দিলেই সমস্যা শেষ।’

বাস্তবতা এত সহজ নয়।

ফিরে যাওয়ার পর তাঁদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? তাঁদের অধিকার কে রক্ষা করবে? তাঁদের সম্পত্তির কী হবে? তাঁদের নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? ভবিষ্যতে আবার বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া প্রত্যাবাসন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের স্বার্থেই তাই প্রত্যাবাসনকে একটি নিরাপত্তা, অধিকার ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।

কক্সবাজারের ভবিষ্যৎও এর সঙ্গে জড়িত

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে কক্সবাজারের ভবিষ্যৎও জড়িত।

উখিয়া-টেকনাফের মানুষ কতদিন এই জনসংখ্যাগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বহন করবে—তার উত্তরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দিতে হবে।

কারণ, একটি সংকটকে দীর্ঘায়িত করারও মূল্য আছে।

সেই মূল্য শুধু অর্থে পরিমাপ করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবিকা, পরিবেশ, সামাজিক সম্পর্ক, আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন।

এখন দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা

রোহিঙ্গা সংকটে নতুন করে আরেকটি বিবৃতি খুব বেশি কাজে আসবে না।

প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ দরকার। প্রত্যাবাসনের জন্য বাস্তব রোডম্যাপ দরকার। মানবিক সহায়তার অর্থায়ন নিশ্চিত করা দরকার। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা দরকার। একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা উন্নয়ন ও সুরক্ষা কাঠামো প্রয়োজন।

অন্যথায় রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে এমন একটি ‘স্বাভাবিক বাস্তবতা’তে পরিণত হবে, যার সঙ্গে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যাবে—কিন্তু যার সমাধান কেউ করবে না।

এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

প্রায় এক দশক আগে যে সংকটকে জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটি যদি আরও এক দশক পরেও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের পাঁচ দফা প্রস্তাব তাই শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য একটি আবেদন নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা:

মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু মানবিক সহায়তা স্থায়ী সমাধানের বিকল্প নয়।

প্রত্যাবাসন প্রয়োজন, কিন্তু নিরাপত্তা ও অধিকার ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই নয়।আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু দায়িত্বের বড় অংশ বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে রেখে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা—

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের দায় কক্সবাজারের মানুষের নয়; সংকটের উৎস যেখানে, স্থায়ী সমাধানের দায়িত্বও মূলত সেখানেই।

এখন প্রশ্ন একটাই—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি এই দায়িত্ব বাস্তবে গ্রহণ করবে, নাকি কক্সবাজারকে আরও বহু বছর একটি অমীমাংসিত সংকটের ভার বহন করতে হবে?


লেখক: ড. জাকী মোস্তুফা টুটুল, 

সদস্য, রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (চ্যাথাম হাউস), ইউ,কে.।

কাওছার আহমদ