দরিদ্র গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে শাবি শিক্ষার্থীর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

post-title

ছবি সংগৃহীত

অজ্ঞতা আর পিছিয়ে পড়া জনপদের অন্ধকার দূর করতে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন এক তরুণ। নাম শামীম মিয়া। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের এই শিক্ষার্থী নিজের গ্রাম শিবজয়নগরকে বদলে দেওয়ার এক নীরব যুদ্ধে নেমেছেন।

সরকারি চাকুরিজীবীহীন এবং উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এই নিভৃত পল্লীতে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে শামীমের হাত ধরে।

জানা যায়, হবিগঞ্জের শিবজয়নগর গ্রামে শামীমই প্রথম শিক্ষার্থী, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রেখেছেন। তবে নিজের এই অর্জনকে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখেন না তিনি। নিজের জীবনে শিক্ষার বাস্তবিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি এলাকার দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করছেন নিরলসভাবে।

সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি শুরু করেছেন ‘আলো ছড়াও শিক্ষার পথে’ নামক ভিন্নধর্মী এক উদ্যোগ। মহল্লাভিত্তিক সচেতন অভিভাবক উঠান বৈঠক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি গ্রামে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন।

শামীমের এই উদ্যোগের সবচেয়ে অভাবনীয় দিক হলো এর অর্থায়ন। নিজের টিউশনির কষ্টার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন গ্রামের শিশুদের জন্য। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহী করতে তিনি নিজের টাকায় খাতা, কলম ও বই কিনে পুরস্কার দেন। সম্প্রতি তার এই মহৎ কাজে সাড়া দিয়ে কিছু শুভানুধ্যায়ী ও প্রবাসী ব্যক্তি সহযোগী হিসেবে এগিয়ে এসেছেন, যা কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়িয়েছে।

শামীমের লড়াইটা কেবল বই-খাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার কাজের প্রধান তিনটি লক্ষ্য হলো- মাসিক কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে স্কুলমুখী করা, গ্রামের মানুষকে বাল্যবিবাহের কুফল ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মকে অন্তত মাধ্যমিক পাস করানো।

শামীম জানান, তার শৈশবের বিদ্যাপীঠ ‘বরতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ বছর নিজের টিউশনির টাকা থেকে কৃতি শিক্ষার্থীদের ৫ হাজার টাকা প্রদান করেছেন। এছাড়াও, তিনি প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে খুতবায় শিক্ষা ও সরকারি বৃত্তি পরীক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। শিশুদের আরবি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করতে রমজানে বিশেষ অনুদানও নিশ্চিত করেন তিনি।

এ বিষয়ে শামীম মিয়া বলেন, ‘আমাদের গ্রামে সরকারি চাকুরিজীবীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। এমনকি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হাফেজ-আলেম, ক্বারীর সংখ্যাও হাতেগোনা। তাই আমার দায়বদ্ধতা ও গ্রামের প্রতি ভালোবাসা থেকে আমি শিবজয়নগর গ্রামের শিক্ষা প্রসার- বিস্তারে নিয়মিত মহল্লাভিত্তিক সচেতন অভিভাবক মাসিক উঠান বৈঠক ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে এবং সমাজকে সহিংসতা, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি ও খুনাখুনির মতো অমানবিক প্রবণতা থেকে মুক্তি দেয়। একটি শিক্ষিত সমাজই পারে শান্তি, শৃঙ্খলা ও জ্ঞানভিত্তিক সহাবস্থানের ভিত্তি রচনা করতে। এই আদর্শকে সামনে রেখেই আমি গ্রামবাসীর কাছে শিক্ষার সুফল ও সম্ভাবনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছি।


এসএ/সিলেট