রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

সিলেটে প্রভাশালী মহলের দখলে সরকারী জলমহাল, ১২ বছরেও উদ্ধার হয়নি

post-title

ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের কানাইঘাটে সরকারের খাস জলমহাল বাদিকুঁড়ি বিল (বদিবিল) ও এর পাশ^বর্তী ব্যক্তি মালিকানাধীন ফসলী ভ‚মি দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয় এক প্রভাবশালী মহলের দখলে রয়েছে। প্রতিবছর ওই জলমহালের মাছ বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছে প্রভাশালী ওই মহল। বারো বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে মাছ বিক্রির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে।

এ ঘটনায় স্থানীয় মইনার পাহাড় মৌজার মো. আব্দুল মুহিত বাদী হয়ে এলাকাবাসীর পক্ষে ২০২৫ ইং সনের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। যার নং-৯৩/২০২৫। একই ঘটনায় স্থানীয় মৃত হাজী রইছ মিয়ার পুত্র মো. তাজুল ইসলাম ও আব্দুল হাইর পুত্র আব্দুল কুদ্দুছ সহ ৩ শতাধিক লোক সিলেটের জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার ও কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে পৃথক আরেকটি অভিযোগ দায়ের করেন। 

এজাহার ও অভিযোগে জানা যায়, উপজেলার ৯ নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ফতেহগঞ্জ হাওর মৌজার ৮৭ নং জে.এল এ অবস্থিত সরকারের খাস জলমহাল বাদিকুঁড়ি বিল (বদিবিল)। এর ভ‚মির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮৩ একর অর্থাৎ কম-বেশি বারো বিঘা জমি। স্থানীয় মীর্জারগড় মৌজার মৃত আহসান মিয়ার পুত্র আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল (৪৮) ও তার আপন ছোট ভাই মহানগর যুবলীগ নেতা রুহেল আহমদ মুরাদ (৪৬) গংরা জলমহালটি দীর্ঘদিন ধরে দখলে রেখেছে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন বেশ কয়েকবার ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কিন্তু ওই প্রভাবশালী মহলের বাধারমুখে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০১১ ইং সনে স্থানীয় নিজ রাজাগঞ্জের মৎস্য ব্যবসায়ী মদরিছ আলী সরকারের ইজারার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাছ ধরতে বিলে যান। তখন সুহেল ও রুহেল গংরা তাকে বাধা দেয়। তিনি শত চেষ্টা করেও বিল দখলে নিতে পারেননি। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে বিল থেকে ফেরৎ আসেন। এরপর আর কেউ এই বিলের ধারেপাশে যেতে পারেননি।

স্থানীয় মইনার পাহাড় মৌজার মো. আব্দুল মুহিত জানান, বাদিকুঁড়ি বিলের পাশে ছোট লামাইশ ও বড় লামাইশ জলমহাল রয়েছে। খাস ওই জলমহালগুলোর পাশে আমাদের পরিবারের ৯ বিঘা সহ এলাকার ব্যক্তি মালিকানাধীন শতাধিক বিঘা ফসলী জমি রয়েছে। বর্ষার মৌসুমে বিলের পানিতে তলিয়ে যায় এসব ফসলী জমি। তখন বিল ও ফসলী জমি একাকার হয়ে যায়। এসময় জীবিকার তাকিদে স্থানীয় মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের লোক বা দরিদ্র লোকজন মাছ ধরার চেষ্টা করলে সুহেল গংরা তাদেরকে বাধা দেয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে একটি মামলাও হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও ভ‚মি অফিসের তহশিলদার সরেজমিন তদন্ত করেছেন। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসন বিলটিতে ১৪৪ ধারাও জারী করেছিল। এরপরও বিলটির দখল ছাড়েনি সুহেল গংরা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে তদন্তকারী কর্মকর্তা কানাইঘাট থানার এস আই মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, এখানে সরকারের খাস জলমহালের সাথে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিও রয়েছে। স্থানীয় কিছু সংখ্যক লোক জনস্বার্থে ব্যয় করার জন্য জলমহালের মাছ বিক্রি করে থাকেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। এ ঘটনার একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।



কানাইঘাট উপজেলা ভ‚মি অফিসের তহশিলদার সত্যপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দু’সপ্তাহ আগে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। এবিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদনও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিয়েছেন বলে জানান।

এদিকে, জলমহালটির পাশেই রয়েছে মইনার পাহাড় মৌজার জেলেপাড়া। এখানে মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের ৪০-৪৫ পরিবারের বসতি। জেলেপাড়ার আরব উল্লাহ ও ইসলাম উদ্দিন জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ধমক ও বাধায় হাওরে জাল ফেলতে পারেন না। যার কারণে অনেক কষ্টে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।

এদিকে, অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল ও তার ভাই রুহেল আহমদ মুরাদ। তারা বলেন, এই বিলের আয়ের টাকা একক কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের কাজে কখনও ব্যয় করা হয়নি। মীর্জার গড় ও ফতেহগঞ্জ হাওর মৌজার ৬টি গ্রামের জনস্বার্থে ব্যয় করা হয়ে থাকে। মীর্জারগড় মৌজার ৩ গ্রাম -মীর্জারগড়, ছোট মীর্জারগড়, খোয়াজপুর  ও ফতেহগঞ্জ হাওর মৌজার আরও ৩ গ্রাম- ফতেহগঞ্জ, নিজ ফতেহগঞ্জ, ফতেহগঞ্জ পূর্বচটি। এই গ্রামগুলোর ভিতরের ছোট কালভার্ট, কাঁচা রাস্তা সংস্কার, স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসা ও ঈদগাহের উন্নয়নমূলক কাজে এ টাকা ব্যয় করা হয়ে থাকে। সামাজিকভাবে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে।

তারা আরও বলেন, এই বিল লীজ বর্হিভ‚ত রয়েছে। সম্ভবতঃ ২০০৭ অথবা ২০০৮ সালে বিলটি লীজে তুলা হলে এলাকাবাসী জনস্বার্থে লীজ বর্হিভ‚ত রাখার জন্য আন্দোলনে নামেন। এরপর এলাকাবাসীর পক্ষে আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল নিজে বাদী হয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রীট করেছেন বলে জানান। 

এ ব্যাপারে কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান শাকিল বলেন, আমার যোগদানের পূর্বের ঘটনা। কাগজপত্র দেখে খোঁজ নিচ্ছি।



 


 

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক