জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্যের...
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।তিনি বলেন, জ্বালানির...
ছবি সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে এবং পণ্যের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন তৈরি না হয়, সে জন্য সরকার সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগান ফ্যাক্টরি মাঠে চা শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিতভাবে দাম সমন্বয় করায় মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মানুষের কাছে আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়।
তিনি বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে যেন অন্য পণ্যের ওপর প্রভাব না আসে, মূল্যস্ফীতি না বাড়ে, সে জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, এটির জন্য আমরা কাজ করছি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সরবরাহব্যবস্থার কোথাও অসংগতি তৈরি হলে তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়তে পারে। সরকার সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, দুই দিন আগেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমদানিকারক ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে একটি বড় সভা হয়েছে। সেখানে পণ্য আমদানি, পরিবহন ও বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে যেখানে যেখানে অসংগতি আছে, সেগুলোর ওপর আমরা দৃষ্টিপাত করছি। যাতে এসব অসংগতি দূর করে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য অভিঘাতকে আমরা সামাল দিতে পারি, সে জন্য কাজ করছি,’ বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
সম্প্রতি গ্যাসের সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকটও কেটে গেছে জানিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এফএসআরইউতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কিছুদিন গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয়েছিল। সেই সমস্যা এখন আর নেই।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় আমদানি করা বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেশে প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরেছে বলে জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিনি ও সয়াবিনসহ যেসব আমদানি করা পণ্য দেশে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেসব কারখানা এখন পূর্ণ উদ্যমে কাজ করছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
তিনি বলেন, ‘মূল্য ইনশাআল্লাহ স্থিতিশীল থাকবে এবং মূল্যের ওপর সেরকম লক্ষণীয় কোনো অভিঘাত ইনশাআল্লাহ আসবে না।’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিশ্বের অনেক দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ে। সেসব দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম পরিবর্তিত হয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লে সেলফ ট্রিগারড হয়, নিজ দেশে মূল্যটা অটোমেটিক অ্যাডজাস্ট হয়। সকালে উঠে দেখবেন পেট্রোল পাম্পে মূল্য বেশি হয়ে গেছে।’
বাংলাদেশে সরকার জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে বলে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মানুষের কাছে সরাসরি অনুভূত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
খন্দকার মুক্তাদির বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব এক খাত থেকে অন্য খাতে যেতে পারে। তাই সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সরকার চায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হোক। সে লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এসময় মন্ত্রী বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য কঠোর মনিটরিং করা হবে বলেও জানান তিনি।এর আগে, সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগান মাঠে সরকারের সিএসআর তহবিলের সহযোগিতায় বিভিন্ন চা বাগানের ১৯৮০ জন শ্রমিকের মাঝে রেইনকোট বিতরণ করেন।
এসময় শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, চা শ্রমিকদের মজুরি কত টাকা হবে শুধু সেটিই ম‚ল বিষয় নয়; একজন চা শ্রমিক যাতে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপ‚র্ণ জীবনযাপন করতে পারেন, সে অনুযায়ী মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চা বাগানগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করতে সরকার কাজ করছে।
চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, চা শিল্পের প্রকৃতি অন্যান্য শিল্পের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। দেশের অনেক চা বাগান দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে এবং কোনো কোনো বাগানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় চা বাগানগুলোকে টেকসই ও লাভজনক করে তোলার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, যেসব চা বাগানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সরবরাহ অবকাঠামোর সুযোগ রয়েছে, সেখানে চা গাছের ক্ষতি না করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বাগানের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি মসলা জাতীয় গাছ, টিম্বারসহ অন্যান্য উপযোগী সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী চা বাগানগুলোতে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা হবে। বাগানের রাস্তাঘাট উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শ্রমিক পরিবারের নতুন প্রজন্ম যাতে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিম‚লক পেশায় যেতে পারে, সে সুযোগও তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, চা শিল্পকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে।
বাগানের আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ শিল্পকে টেকসই করার লক্ষ্য রয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, সদরের ইউএনও খোশন‚র রুবাইয়াতসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা এবং চা বাগানের শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।
এসএ/সিলেট