কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক...
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকের ৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র...
চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
ছবি সংগৃহীত
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকের ৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। তাঁদের মধ্যে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল হাসপাতালটিতে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা। বিভিন্ন সময়ে মেডিকেল অফিসার ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যে বদলি কিংবা প্রেষণে তাঁদের অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। এতে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের ৩৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা উৎপল দাস, মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মুসাদ্দিক হোসেন ও ডা. আবদুর রহমান আয়েজ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যে চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইকবাল বাহার সপ্তাহে রবি ও বৃহস্পতিবার দায়িত্ব পালন করেন। বাকি চার দিন তিনি সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে কর্মরত থাকেন।
এ ছাড়া হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এ এফ এম রেজাউল ইসলাম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মৃনাল সাহা, অর্থোপেডিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মাসউদুর রহমান এবং শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু বকর নাসের রাশু হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে তাঁদের রোগী দেখার জন্য পৃথক কক্ষ বরাদ্দ নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কক্ষে বসেই তাঁরা দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ডা. মোহাম্মদ মাসউদুর রহমান ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. মো. সাদেকুল আলম প্রেষণে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনুল ইসলাম প্রেষণে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন মো. নাহিদ ইসলাম বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত রয়েছেন।
হাসপাতালে শূন্য থাকা পদগুলোর মধ্যে রয়েছে ইএনটি, চক্ষু, গাইনি, সহকারী সার্জন, মেডিকেল অফিসার, অ্যানেসথেটিস্ট, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন (গাইনি ও চক্ষু), মেডিকেল অফিসার (আয়ুর্বেদিক), প্যাথলজিস্ট ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার।
সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন জরুরি বিভাগে প্রায় ৩০০ এবং আবাসিক ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। টিকিট কাউন্টারে রোগীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক রোগীকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে কথা হয় কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামের হানিফ মিয়ার স্ত্রী জুবেদা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর দেড় মাস বয়সী মেয়ে তালহা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে সিলেটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক রোগীকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়েই জেলা সদর কিংবা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এতে একদিকে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ে, অন্যদিকে স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু বকর নাসের রাশু, মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মুসাদ্দিক হোসেন ও ডা. আবদুর রহমান আয়েজ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মশালা ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সভায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার অংশ নিতে গেলে চিকিৎসাসেবা আরও ব্যাহত হয়। দ্রুত চিকিৎসক সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা উৎপল দাস বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। চিকিৎসক সংকট নিরসন এবং প্রেষণে থাকা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রেষণাদেশ বাতিলের জন্য সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. জাকির হোসেন বলেন, জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শনিবার সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে গিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। খুব শিগগিরই মৌলভীবাজার জেলায় বেশ কয়েকজন চিকিৎসক পদায়ন করা হবে। এরপর কুলাউড়াসহ অন্যান্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কুলাউড়া আসনের সংসদ সদস্য ও উপজেলা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আলহাজ মো. শওকতুল ইসলাম শকু বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কুলাউড়া হাসপাতালের চিকিৎসক ও জনবল সংকট নিরসন এবং হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশের বিভিন্ন উপজেলাসহ সিলেট বিভাগের তিনটি উপজেলার মধ্যে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। এর প্রাথমিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয়টি তিনি পুনরায় সংসদে উত্থাপন করবেন বলেও জানান।
এসএ/সিলেট