জকিগঞ্জে সুরমা পাড়ের মরিচাবাসীর কষ্ট লাঘব হবে কবে?

post-title

ছবি সংগৃহীত

এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী :: সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত বৃহৎ জনপদ মরিচা। প্রায় ৪ হাজার মানুষের বসবাস এ গ্রামে; ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। একসময় যোগাযোগের দিক থেকে এগিয়ে থাকা এই গ্রামটি বর্তমানে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামের উত্তরাংশের মানুষের কাছে যোগাযোগব্যবস্থা এখনো বড় এক দুর্ভোগের নাম।

জকিগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে অবস্থিত মরিচা যাত্রী ছাউনীর সামনে থেকে শুরু হয়ে দেশের দীর্ঘতম সুরমা নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত এই গ্রাম। পূর্বে ৯নং মানিকপুর ইউনিয়নের আকাশ মল্লিক ও বাল্লাহ, পশ্চিমে পেট্রোল বাংলা-টু-আটগ্রাম বাজারের এলজিইডি সড়ক, উত্তরে সুরমা নদী এবং দক্ষিণে জকিগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক—প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে মরিচা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ।

অপরূপ প্রকৃতি, কিন্তু যোগাযোগে চরম দুর্ভোগ:


মরিচার উত্তরের ডগিরপার, খাসিরচক, নয়ঘরি, লক্ষীপুর ও উত্তর মরিচা—এই বিশাল এলাকার মানুষ বর্ষা মৌসুমে কিংবা বৃষ্টির দিনে এখনো কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে বাধ্য হন। সুরমার তীর ঘেঁষা এসব জনপদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও যোগাযোগব্যবস্থার বেহাল দশা যেন সেই সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিয়েছে। বিয়ে-শাদী, রোগী পরিবহন, শিশুদের স্কুল-মাদ্রাসায় যাতায়াত কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবকিছুতেই দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয়দের। শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষায় অনেক রাস্তা হয়ে পড়ে প্রায় অচল।

একটি পাকা রাস্তার অপেক্ষায় হাজারো মানুষ:


মরিচা গ্রামের সবচেয়ে বড় দাবি—উত্তর মরিচা নতুন মসজিদ থেকে দক্ষিণ মরিচা এলজিইডির পাকা রাস্তা পর্যন্ত সরকারি আইডিভুক্ত এক কিলোমিটার রাস্তাটি পাকাকরণ।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই রাস্তাটি পাকাকরণের আশায় তারা বিভিন্ন দপ্তর ও জনপ্রতিনিধির দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। বছরের পর বছর ধরে শুনেছেন—“হবে”, “প্রক্রিয়াধীন”, “শিগগিরই কাজ হবে”—কিন্তু বাস্তবে এখনো পাকা রাস্তার দেখা পাননি।


অথচ এই একটি রাস্তা পাকা হলে উত্তর মরিচার বিশাল এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে।


যেসব রাস্তা উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি:


মরিচাবাসীর দাবিগুলো শুধু একটি রাস্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাস্তা দ্রুত উন্নয়ন করা প্রয়োজন—
সুরমা ডাইক–উত্তর মরিচা শাহী ঈদগাহ ভায়া খাসিরচক মসজিদ ও পূর্বমুখী রাস্তা পাকাকরণ।


সুরমা ডাইক–ডগিরপার জামে মসজিদ দক্ষিণের রাস্তা পাকাকরণ।


আটগ্রাম বাজার থেকে সুরমা ডাইক হয়ে পূর্বমুখী রাস্তা আকাশ মল্লিক গ্রাম পর্যন্ত ব্লক, আরসিসি ঢালাই অথবা পাকাকরণ।


মরিচা এলজিইডি পাকা সড়ক থেকে মরিচা জামে মসজিদ ভায়া রঘুরচক রাস্তা উন্নয়ন।


জকিগঞ্জ-সিলেট সড়কের রায়গ্রামের পূর্বের ব্রিজের পশ্চিম দিক থেকে খালের পশ্চিম পাড় দিয়ে নতুন যোগাযোগ রাস্তা নির্মাণ।


এসব সড়ক উন্নয়ন করা গেলে শুধু মরিচা নয়, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষেরও যোগাযোগব্যবস্থা অনেক সহজ হবে।


২০২২ সালের বন্যার ক্ষত এখনও স্পষ্ট:


পুরো মরিচা গ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা হলো গ্রামের মূল প্রবেশপথের এলজিইডির পাকা সড়কটি ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। বন্যার পানির স্রোতে রাস্তা ভেঙ্গে গেলেও আজ অবধি সংস্কার হয়নি। উপজেলার তুলনামূলক অনেক ভালো রাস্তা সংস্কার হলেও এ রাস্তা রয়ে গেছে সেই ভাঙা অবস্থায়। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা এখন জরুরি।


এটি শুধু একটি রাস্তা নয়—মরিচাবাসীর উপজেলা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। তাই দ্রুত সংস্কার না হলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।


ডগিরজুরি খাল খননের উদ্যোগ আশার আলো:


মরিচাবাসীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সুরমা ডাইক থেকে দক্ষিণমুখী ডগিরজুরি খালটি পুনঃখনন এবং খালের পাড় দিয়ে রাস্তার জন্য মাটি ভরাট করা।


জানা গেছে, সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এমপি মহোদয়ের মাধ্যমে খালটি খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে তালিকা পাঠানো হয়েছে এবং সেটি অনুমোদনও হয়েছে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে এ কাজ নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে।


একইভাবে মরিচা নয়ঘরি জামে মসজিদ ও উত্তর মরিচা শাহী ঈদগাহের উন্নয়নের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ডিও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে এ দুটি প্রতিষ্ঠানেও উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।


পানির সংকটও রয়েছে-

গ্রামের মানুষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে পুরো মরিচা গ্রামে অন্তত ৩০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।


শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে-


মরিচায় রয়েছে মরিচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর মরিচা শিশু বিদ্যালয় এবং একটি হাফিজি মাদ্রাসা। এছাড়া গ্রামে রয়েছে প্রায় ৬টি মসজিদ ও একটি শাহী ঈদগাহ। গ্রামের দক্ষিণ অংশে রয়েছে মরিচা জামে মসজিদ। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা মরিচা বাগান বাড়িও এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।


কিন্তু শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—কোনোটিই মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক সংকট দূর করতে পারে না, যদি যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না হয়।


মরিচা শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি সম্ভাবনাময় একটি জনপদ


সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত মরিচার রয়েছে বিশাল কৃষিজমি, সবুজ প্রকৃতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন ও সম্ভাবনাময় যোগাযোগের সুযোগ। অথচ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।


মরিচাবাসীর দাবি খুব বড় কিছু নয়—তারা চান চলাচলের উপযোগী রাস্তা, নিরাপদ পানি, খাল পুনঃখনন, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংস্কার।


বিশেষ করে উত্তর মরিচা নতুন মসজিদ থেকে দক্ষিণ মরিচা এলজিইডি সড়ক পর্যন্ত সরকারি আইডিভুক্ত রাস্তাটি পাকাকরণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


প্রশ্ন একটাই—


সুরমা পাড়ের মরিচাবাসীর এই দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব হবে কবে?


এলাকাবাসী এবার সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এমপি মহোদয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব উন্নয়ন দাবি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন। প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি নয়—এবার তারা বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান।


মরিচাবাসীর প্রত্যাশা—রাস্তা হবে, খাল খনন হবে, পানি আসবে; আর সুরমা পাড়ের এই জনপদও একদিন যোগাযোগ ও উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত হবে। এই হলো সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার রাস্তা ঘাটের আলোকচিত্র। উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গুলো বাস্তবায়ন হলে সৌন্দর্যের পূর্ণ রুপ ধারণ করবে।


এসএ/সিলেট