সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের বুকজুড়ে সবুজে...
এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী :: সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত ছোট্ট একটি গ্রাম রায়গ্রাম। আয়তনে ছোট হলেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য...
ছবি সংগৃহীত
এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী :: সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত ছোট্ট একটি গ্রাম রায়গ্রাম। আয়তনে ছোট হলেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর সম্ভাবনায় গ্রামটি যেন নিজস্ব একটি পরিচয় বহন করে। গাছগাছালি, সবুজের সমারোহ আর বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া জকিগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক গ্রামটির সৌন্দর্যকে করেছে আরও আকর্ষণীয়।
আনুমানিক ১ হাজার ৩০০ মানুষের বসতি রায়গ্রামে। ভোটার রয়েছেন প্রায় ৬০০ জন। গ্রামের বুক চিরে মহাসড়ক চলে যাওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্য অনেক গ্রামের তুলনায় রায়গ্রামের অবস্থান বেশ সুবিধাজনক। তবে এই সুবিধার আড়ালে রয়েছে কিছু মৌলিক উন্নয়ন-প্রয়োজন, যেগুলো পূরণ হলে গ্রামটির জীবনমান আরও উন্নত হতে পারে।
ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো
রায়গ্রামে রয়েছে একটি বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন জামে মসজিদ এবং একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ। ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
এছাড়া রয়েছে একটি শাহী ঈদগাহ ও একাধিক সম্মিলিত গোরস্থান। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে এসব স্থাপনার উন্নয়ন ও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ঈদগাহ ও গোরস্থানগুলোর প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হলে গ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ আরও সুন্দর ও সুসংগঠিত হবে।
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার আক্ষেপ
রায়গ্রামের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো শিক্ষা অবকাঠামোর ঘাটতি। গ্রামে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। গ্রামের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে রায়গ্রাম সেলিনা ইসলাম হাফিজিয়া মাদ্রাসা।
প্রতিষ্ঠানটিকে ইবতেদায়ী পর্যায় থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করা হলে শুধু রায়গ্রাম নয়, আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জন্য নিজ গ্রামে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি দূরের প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ভোগান্তিও কমবে।
যে উন্নয়নগুলো এখন সময়ের দাবি
রায়গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলোর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। রায়গ্রাম সেলিনা ইসলাম হাফিজিয়া মাদ্রাসার সামনের জকিগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে সোজা উত্তরমুখী রাস্তাটি সংস্কার ও প্রয়োজনীয় অংশ পাকাকরণ করা প্রয়োজন। একইভাবে মহাসড়ক থেকে গ্রামের মধ্যবর্তী আরেকটি রাস্তারও সংস্কার ও পাকাকরণ জরুরি।
গ্রামের দক্ষিণ দিকে হাওরমুখী একটি কাঁচা রাস্তা রয়েছে। কৃষিজমি ও হাওর এলাকার মানুষের চলাচল এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে রাস্তাটিও পাকাকরণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া গ্রামের অন্তত ১২টি পরিবারে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গভীর নলকূপ স্থাপন করা প্রয়োজন। নিরাপদ পানির এই মৌলিক চাহিদা পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
চারদিকে কৃষি ও সবুজের বিস্তার
রায়গ্রামের পূর্বদিকে বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মাঠ। পশ্চিমে রয়েছে আটগ্রাম-চারিগ্রাম এলাকা। উত্তরে চারিগ্রাম এবং দক্ষিণে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও হাওর। ফলে গ্রামটির চারপাশে রয়েছে প্রকৃতির এক অনন্য আবহ।
বর্ষায় হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর সবুজ প্রকৃতি, অন্যদিকে ফসলের মাঠ—সব মিলিয়ে রায়গ্রামের পরিবেশ হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর। আর সেই সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে চলে যাওয়া জকিগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক গ্রামটিকে দিয়েছে ভিন্ন এক সৌন্দর্য।
সম্ভাবনা আছে, প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত উদ্যোগ
রায়গ্রামে বড় কোনো সরকারি বাজেটের প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা হয়তো অন্য অনেক এলাকার মতো দৃশ্যমান নয়—কারণ গ্রামের বুক দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক চলে গেছে। কিন্তু একটি জনপদের উন্নয়ন শুধু বড় প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষা, অভ্যন্তরীণ সড়ক, নিরাপদ পানি, ঈদগাহ ও গোরস্থান—এসব মৌলিক অবকাঠামোর উন্নয়নও মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
পরিকল্পিতভাবে এসব ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন করা গেলে রায়গ্রাম হয়ে উঠতে পারে আরও সুন্দর, আধুনিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় একটি গ্রাম।
সবুজে ঘেরা রায়গ্রাম তাই শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; এটি প্রকৃতি, কৃষি, মানুষের সরল জীবন আর সম্ভাবনার এক সুন্দর সমন্বয়। মহাসড়কের বুকজুড়ে যার সৌন্দর্য প্রতিদিন পথিকের চোখে পড়ে—সেই রায়গ্রাম এখন অপেক্ষায় কিছু প্রয়োজনীয় উন্নয়ন-উদ্যোগের। কারণ এ রাস্তা দিয়ে স্কুল কলেজের হাজারো ছাত্র-ছাত্রীরা যাতায়াত করেন।
এসএ/সিলেট