বাসভাড়া বাড়াল সরকার
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে বেড়েছে ১১ পয়সা বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।...
ছবি: সংগৃহীত
সিলেট বিভাগের হাওরের ধান ক্ষেতকে ঘিরে কৃষকরা ‘স্বপ্ন বুনেন ও স্বপ্ন দেখেন’। সেই স্বপ্ন অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেসে যায়। এবারও আগাম বন্যার পদধ্বনি ও শিলা বৃষ্টি রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে ধান কাটার শ্রমিক ও ডিজেলের সংকট। এ অবস্থায় ভেসে যেতে পারে কৃষকের বুকভরা স্বপ্ন ও আশা। এমন আশঙ্কা জানালেন সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার কৃষকরা।
সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি হাওর রয়েছে। অন্য তিন জেলা-সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে উল্লেখযোগ্য হাওর রয়েছে। এসব হাওরে বুরো, আমন সহ নানা জাতের ধান ও মৌসুমী রবি শস্য চাষ করা হয়। ফসলের মধ্যে বুরো ধান প্রতিবছর বন্যার ঝুঁকিতে থাকে।
এবার বন্যার আশঙ্কায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দ্রæত ধান কাটার নির্দেশনা দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে পাউবো সুনামগঞ্জ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়- বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার উজান অববাহিকায় বৃষ্টিপাত বাড়ছে। এর ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও বাউলাই নদীর পানি দ্রæত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী সাতদিন তা অব্যাহত থাকবে। ফলে যেকোনো সময় আগাম বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এছাড়া হাওরের নিচু এলাকায় অতি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এই পরিস্থিতিতে হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় যেসব জমির অন্তত ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে, সেগুলো দ্রæত কেটে নেওয়ার জন্য কৃষকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়।
তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন পাউবো সুনামগঞ্জ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি জানান, জেলার নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। উজানের পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত হলে সুরমাসহ সব নদীর পানি দ্রæত বাড়তে থাকে।
এদিকে, স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, শ্রমিক ও ডিজেল সঙ্কটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে ধান কাটা। চাহিদা মতো ডিজেল পাচ্ছেন না কৃষকরা। পেলেও কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। প্রতি লিটার ডিজেল বিভিন্ন হাট থেকে ১৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। খরচ বেড়ে যাওয়ায় নানা কারণে ধান কাটার গতি কমে যাচ্ছে। এছাড়া ধানের নায্যমূল্য পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওর রয়েছে। এবার সুনাগঞ্জে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ধান কাটা। ধান কাটার শ্রমিকসহ মাঠে কাজ করছে ৬০২টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন। তবে ডিজেল সঙ্কটে অনেকে মেশিন ব্যবহার করতে পরছেন না।
পাখিমারা হাওরের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ধান কাটায় হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করতে পারছেন না তিনি। আবার শ্রমিকও মিলছে না। ফলে বন্যার শঙ্কা স্বত্তে¡ও দ্রæত ধান কাটতে পারছেন না। তিনি আরও বলেন, সরকার ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে। তারপর ডিজেল মিলছে না। আরও ২০-৩০ টাকা বেশি দিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে।
ওই এলাকার হারভেস্টার মেশিনের মালিক আবদুল কাদির বলেন, তেল সংকটের তার একটা মেশিন বন্ধ রয়েছে। চাহিদা থাকা স্বত্তে¡ও কৃষকরা ভাড়া নিতে পারছেননা।
তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরপারের বড়দল গ্রামের কৃষক ও হারভেস্টার মালিক মুছিহুর রহমান মিলন জানান, ডিলারদের কাছে ডিজেল কেনার জন্য কৃষি অফিস থেকে একটি টোকেন দেওয়া হয়। সেই টোকেন পেতে হলে এনআইডি কার্ড ও হারভেস্টারের কাগজপত্রে কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নিতে হচ্ছে। স্বাক্ষর নিতে গিয়ে হারভেস্টার মালিকদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। এভাবে দিন পার হয়ে যায় টোকেনে স্বাক্ষর পেতে। পরে সেই টোকেন নিয়ে কোনো রকম ডিলারের দোকানে পৌঁছতে পারলে ডিলার বলে দেয় আজ ডিজেল শেষ হয়ে গেছে। তারপর ডিজেল না নিয়ে খালি ট্যাঙ্কি হাতে ফিরতে হয়।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার একাধিক কৃষক জানান, হারভেস্টার মেশিন চালাতে দৈনিক ১০০-১২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয় এবং পাওয়ার থ্র্রেসার মেশিনে লাগে ১২-১৫ লিটার। কিন্তু এই পরিমাণ ডিজেল প্রতিদিন পাওয়া যায় না। ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে সম্প্রতি কয়েকজন কৃষক উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউএনওর দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন।
ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান বলেন, পাম্প থেকে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বেশির ভাগ হাওরের জমির ফসল আঁধাপাকা ও কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। পুরোপুরি পাঁকতে আরও সপ্তাহ দিন সময় লাগতে পারে। জেলার আবাদকৃত ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমির মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০ হাজার হেক্টর জমির ফসল কর্তন হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওর রয়েছে। এবার জেলায় ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার হেক্টর ধান কৃষকরা ঘরে তুলছেন। বাকি ধান ঘরে তুলতে আরো সময় লাগবে।’
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ডিজেলের সঙ্কট নেই। তবু সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা সমস্যা আছে। এ কারণে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আমরা এখন কৃষকদের রেশনিংয়ের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ করছি।
কাওছার আহমদ