ধানের শীষের বিজয়ের মধ্য দিয়েই...
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ও এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মীনি তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেছেন, “ধানের শীষের বিজয় হলে...
ছবি সংগৃহীত
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে সিলেটে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায়। বক্তারা ভয়মুক্ত ভোটাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তা না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাংক হিসেবে না দেখে অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে নগরীর একটি হোটেলের হলরুমে “প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য: সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
আলোচনায় নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
শুরুতে সিজিএসের সভাপতি ও গোলটেবিল আলোচনার সঞ্চালক জিল্লুর রহমান বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনি কর্মসূচিতে তাদের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচন এলেই নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, হামলা ও হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়। ভোটাধিকার কেবল ব্যালট দেওয়ার সুযোগ নয়, ভয়মুক্ত পরিবেশে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাও।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর বলেন, নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে থাকে। হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও বিচার হয় না। প্রশাসনের কাছে গেলে কার্যকর সমাধান পাওয়া যায় না। তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সচেতন নাগরিক কমিটি সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, নারী ও সংখ্যালঘুদের জন্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। নৃশংস সহিংসতার ঘটনা বাড়লেও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া দুর্বল।
সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ব্যুরো চিফ ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, মব সহিংসতা, গণমাধ্যমের ওপর চাপ এবং আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি না হলে পরিবর্তন আসবে না।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সিলেট জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
খাসিয়া নারী প্রতিনিধি হিলদা মুকিম বলেন, আদিবাসীদের এখনও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার ফলে তারা অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভোট দিতে গেলে হয়রানির ভয় কাজ করে।
পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদের সভাপতি গৌরাঙ্গ পাত্র বলেন, প্রায় ৮০টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকারে তার প্রতিফলন নেই। ভোট দেওয়া ও না দেওয়ার—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি রয়েছে।
চা শ্রমিক নেতা হরি সবর ও চা শ্রমিক নেত্রী শেলী দাস বলেন, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও ভূমি অধিকারের প্রশ্নে চা শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার।
ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মিলন ওঁরাও ভূমি সংকটের টেকসই সমাধান চান। প্রেসবেট্রিয়ান চার্চের চেয়ারম্যান ডিকন নিঝুম সাংমা বলেন, কথা বললেই সংকটে পড়ার ভয় কাজ করে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সদস্য সচিব রাজিব কুমার দে বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিচার না হওয়ায় অনাস্থা বেড়েছে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শামসুল বাসিত শেরো প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন।
অ্যাডভোকেট মলয় পুরকায়স্থ বলেন, ভোট দেওয়া ও না দেওয়ার—দুই অবস্থাই সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চা শ্রমিক সম্প্রদায় নিয়ে ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি মিন্টু দেশোয়ারা চা শ্রমিকদের রাজনৈতিক অবহেলার কথা তুলে ধরেন।
খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি অনিলজয় ডিকার ভূমি ও শিক্ষা অধিকারের আইনি সুরক্ষার দাবি জানান। সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় সী শেখর বলেন, পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
আইনজীবী রনেন সরকার রনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। এথনিক কমিউনিটি ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লক্ষীকান্ত সিংহ রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সংখ্যালঘু বিষয়ক অঙ্গীকারের ঘাটতির কথা বলেন।
হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থা সিলেটের সভাপতি মিস সুকতা তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের সমান নাগরিকত্ব ও সংসদে প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান।
গোলটেবিল আলোচনায় সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রণব কান্তি দেব, বাংলাদেশ দলিত পরিষদ সিলেট বিভাগের সভাপতি মিলন রবিদাস, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ সিলেট অঞ্চলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উৎপল বড়ুয়া, বৌদ্ধ সমিতি সিলেটের সভাপতি চন্দ্র শেখর বড়ুয়া এবং উদ্যোক্তা পীযূষ কান্তি পুরকায়স্থ প্রমুখ অংশ নেন।
এসএ/সিলেট