বিশ্বনাথ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কামার শিল্প!

post-title

ছবি সংগৃহীত

বদরুল ইসলাম মহসিন, বিশ্বনাথ :: প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বনাথ বাজারে আগের মত আর টুং টাং শব্দ তেমন শুনা যায় না। একসময় স্থানীয় বাজারগুলোতে টুং/টাং আর টকটক শব্দে মুখরিত থাকতো ‘কামার গল্লিগুলো।

লোহা আর আগুনের সম্পর্কে থাকা, সময়ের সাথে সাথে ‘কামার শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাপ/দাদার বংশ পরম্পপরায় চলে আসা এক সময়ের ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জের বাজার থেকে। সরেজমিনে বিশ্বনাথের বিভিন্ন বাজার ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, হাতে গোনা দুই/তিনটি পরাবার তাদের পৈতৃক পেশাকে জীবন জীবিকার একমাত্র পেশা হিসাবে ধরে রাখছেন তারা। তাদের অনেকেই জানান, নানান রোগ বালাই এবং নানা সমস্যা থাকায় তাদের অনেকেই এ পেশা বদল করে বিভিন্ন শহরে গিয়ে অন্য কাজ করছেন।

আমাদের কামার শিল্পটিকে ধরে রাখতে হলে সরকারিভাবে আমাদেরকে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া খুবই প্রয়োজন বলে তারা জানান। প্রতিটি সাপ্তাহিক বাজারে বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষজন তাদের পরিবারের জন্য দা, বঠি, কুড়াল, কুদাল, কাছিসহ কৃষিকাজে ব্যবহারিত নানান উপকরণ তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করতেন কামার শিল্পিগণ। আধুনিকতার ছুয়ায় বিদেশি এসব পণ্য বাজারে আসার কারনে সমস্যায় জর্জরিত শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

কাটের কয়লা, লোহা, স্পিরিং কাচাঁমালের অভাবে অনেকেই পেশা বদল কনে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। শতশত বছর ধরে চলে আসা কামার শিল্প’ জড়িত ছিল অনেক পরিবার। এখন কয়েকটি পরিবার তাদের বংশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কষ্টের মাঝেও কাজ করছেন বলে জানান। তাদের কয়েকজন বলেন, আগের মত তেমন কাজ নাই, আগে যেভাবে দিনরাত লোহা পিটিয়ে কাজ করতাম, এখন তেমন কোন কাজ নাই। বেশিরভাগ সময় বসেই থাকতে হয়। অন্য কোন কাজ জানা না থাকায় পরিবারিক পেশাকে আকড়ে ধওে রাখছি।

বিশ্বনাথের দক্ষিণ মিরেরচর গ্রামের শত বছরের কামার বাড়ীর বর্তমান সবচেয়ে পুরাতন কামার কারিগড়, রমা কান্ত দে বলেন, আমার দাদার/বাবা থেকে শুরু করে আমাদেও দাদার বংশের বাবা/চাচারাও এ পেশায় কাজ করছেন। পিতা মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা ৩ ভাইসহ চাচাতো এক ভাই শতবছরের ঐতিহ্য ধরে রাখছি। লেখাপড়া কতটুকু করছেন, জিজ্ঞাস করলে তিনি জানান, পরিবারের অভাব থাকায় ছোট থেকেই বাবার সাথে কামার পেশায় চলে আছি।

সময় যতই যাচ্ছে বয়স ভাড়ছে, আগের মত কাজ করতে পারি না, যদি সরকারিভাবে আমাদেরকে সহযোগীতা করা হয়, তাহলে এ শিল্প বেচেঁ যাবে। আমরা যেসময় জিনিসপত্র তৈরি করি, সেসব দা,কাস্তিসহ কৃষিকাজের এসব পণ্য আগের মত আর চলে না। এ জন্য কামার শিল্প দিনদিন কমতেছে। আর কোন কাজ না জানা থাকায় পেশা বদল  করতেও পারছি না। আবার পৈত্রিক পেশাকে ধওে রাখছি যাতে আমাদেও ঐতিহ্য নষ্ট না হয়। তিনি বলেন আমার পরিবারের দুই ভাই ও ছেলে/মেয়েসহ ৮জন। আমারা সকলেই কামার পেশায় কাজ করতেছি। সিলেটে বিশেষকরে কোরবানি ঈদের সময়কাল এবং আগন মাসে ধান মৌশুমে কামার শিল্পে কাজের চাপ থাকে। এখন বিদেশি এসব পণ্য বাজারে থাকায় কামার পাড়ায় তেমন কাষ্টমার নাই।

কামার পাড়ার অধির চন্দ্রধর, কালাচান, ও নিজঞ্জন দে, জানান, আমাদের এখানে আগে প্রায় ৬/৭টি ঘর ছিলো যারা এই কামার শিল্পের সাথে জড়িত ছিলো এখন মাত্র ২টি ঘর এই শিল্পের সাথে জড়িত আছে। তবে এই পেশার যে দৈন্যদশা তাতে এই সংখ্যা অচিরেই কমে যাবে। আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে অর্থাভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিল্পকে টিকিয়ে  রাখতে সরকারি সহায়তার কথা বললেন স্থানীয় অনেকেই। দেশীয় ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এখনি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে এমন প্রত্যাশা সবার।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্প রয়েছে। প্রথম ধাপে শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে প্রশিক্ষণ হবে। কামার শিল্পিদের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ রয়েছে। তারা চাইলে সরকারিভাবে সহযোগিতা নিতে পারবে।

এসএ/সিলেট