সিলেটে আধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স...
শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও...
ছবি সংগৃহীত
চা শুধু একটি পণ্য নয়,এটি শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের প্রতীক। বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের জীবন এক অবর্ণনীয় দুঃখ ও বঞ্চনার প্রতীক। শতবর্ষ ধরে তারা চা বাগানগুলোয় ঘাম জরানো কায়িকশ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত যৎসামান্য অমানবিক দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে চলছে চা- শ্রমিকদের মানবেতর জীবন। শ্রমের ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার এখনো অনিশ্চিত।
নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন সময় আন্দোলন করে তারা আজও তাদের ন্যায্য অধিকার পায়নি।
কিন্তু ঐ চা-পাতা দিয়ে দেশের সকল জায়গায় সকাল-সন্ধ্যার নাশতায়, বন্ধুদের আড্ডায়, মিটিংয়ে কিংবা মেহমান আপ্যায়নে, চা যেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গরম ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা দিয়েই আমাদের দিন শুরু হয়। চা'কে আমাদের জাতীয় পানীয় বললে খুব একটা ভুল হবে না। চা-শ্রমিকদের কতটা অমানসিক পরিশ্রম ও মানবেতর জীবনযাপনের করুণ কাহিনি রয়েছে। চা-শ্রমিকদের খাবারের তালিকায় ১৭৭ টাকার মজুরিতে বড় মাছ কিংবা মাংস যেন বিলাসিতা।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার চা-শ্রমিক রিপন রায়ের পরিবারের। শুধু একটি পরিবার নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব চা-শ্রমিক পরিবারই এমন মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের সবার জীবনই এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।
বাংলাদেশে সব মিলিয়ে চা বাগান ২৫৬টি। এর মধ্যে বাণিজ্যিক চা বাগানের সংখ্যা ১৬৮টি। এসব চা বাগানে নিবন্ধিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩ হাজারের বেশি। চা-শিল্প বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে ১ শতাংশ অবদান রাখছে। দেশে চা-শিল্পের সূচনা মূলত ব্রিটিশদের হাত ধরে। তৎকালে ভারতের উত্তর প্রদেশ, মদ্রাজ, ওড়িশা, বিহার প্রভৃতি অঞ্চল থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা। কালের বিবর্তনে তারা এ দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। তাদের কিছু অংশ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের হয়ে মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের নাগরিক হয়েও তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা তারা ভোগ করতে পারেন না। শ্রমিক হিসেবে দৈনিক ন্যূনতম ২৩ কেজি চা পাতা সংগ্রহের শর্তে একজন চা-শ্রমিক ১৭৮ টাকা মজুরি পান। দৈনিক ২৩ কেজির বেশি চা পাতা সংগ্রহ করলে সপ্তাহ শেষে বাড়তি ৭টাকা কেজি ধরে ঐটাকা পাবে । অন্যদিকে ২৩কেজির কম চা পাতা সংগ্রহ করলে মানবিক বিবেচনায় সপ্তাহ শেষে সমূদয় পাওনা টাকা পরিশোধ করা হয়। অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের এই বাজারে এই অর্থ নিত্যান্তই নগণ্য।
দুই বছর আগে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ১১৮ টাকা। ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেন চা-শ্রমিক নেতারা। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১৭৮ টাকা মজুরি নির্ধারিত করা হলেও অদ্যাবধি ঐ ১৭৮টাকায় তাদের দিনকাল চলছে। দৈনিক মজুরির পাশাপাশি এসব শ্রমিকের রেশন, বোনাসসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে।
প্রত্যেক চা-শ্রমিককে আবাসিক সুবিধা, ফ্রি চিকিৎসা ও প্রায় ৪৬ কেজি রেশন দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতি কেজি বাড়তি চা পাতা সংগ্রহের জন্য বাড়তি বোনাস ও বিভিন্ন ভাতা দেওয়া হয়। চা-শ্রমিকদের জন্য ফ্রি চিকিৎসাসেবার কথা বলা হলেও এর মান যথেষ্ট বাজে এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। চা-শ্রমিকদের অভিযোগ, এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে যথাযথ সেবা দেওয়া হয় না ও সার্বক্ষণিক চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন বলে দাবি করলেও মূলত চা বাগানগুলোয় প্রাথমিক শিক্ষার পর আর পড়াশোনার সুযোগ নেই বললেই চলে। এর ফলে চা-শ্রমিকদের বেশির ভাগ সন্তান প্রাইমারির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।
জাফলং চা-বাগানের শ্রমিক জুলেন নায়েক, রিপন রায়সহ আরোও কয়েকজন বলেন, রেশনের পরিবর্তে আমরা ধানক্ষেত করি, যার কারণে সরকার কর্তৃক রেশন পাইনা। কিন্তু ধানক্ষেত করেও যে ধান পাই তাতেও আমাদের সংসার চলেনা।
এ ছাড়া এত কম উপার্জনে সন্তনদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। অনেক চা-শ্রমিকই বাড়তি উপার্জনের আশায় অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের চা পাতা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করে। এভাবে পরবর্তী প্রজন্মও চা-শ্রমিক হিসেবেই বড় হয়। দারিদ্র্যের গোলকধাঁধায় থেকেই কেটে যায় তাদের বাকি জীবন। চা বাগানগুলোয় নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হন। বাংলাদেশের চা-শ্রমিকের প্রায়ই নারী। তাদের বেশির ভাগই অপুষ্টিতে ভোগে এবং পর্যাপ্ত সেনিটেশন ও নিরাপদ মাতৃত্বের সুবিধা পান না। নারী চা-শ্রমিকদের মাত্র চার মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয়। চা বাগানগুলোয় বাল্যবিয়ের হার বেশি এবং ১৮বছরের আগেই মা হন অনেক কিশোরী। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ নানা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চা-শ্রমিকরা। বছরের পর বছর ধরে নামমাত্র মজুরিতে অমানসিক পরিশ্রম করে যাচ্ছে এ মানুষগুলো।
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে একটানা কাজ করেই যাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, ২৩ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে হবে, নইলে যে নির্ধারিত ১৭৮ টাকাও পাওয়া হবে না এ যেন নব্য দাসত্ববাদ। সরকারের উচিত, চা-বাগান মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে চা-শ্রমিকের মজুরি নুন্যতম ৫০০টাকা নির্ধারণ করা। পাশাপাশি, চা-শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। প্রতি বছর চা রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা আমরা অর্জন করছি, তার বড় কৃতিত্ব চা-শ্রমিকদের। দাসত্ব নয়, চা-শ্রমিকদের প্রাপ্তি হওয়া উচিত যথাযথ সম্মান ও অধিকার।
এসএ/সিলেট