জকিগঞ্জে সৌন্দর্যের গ্রামগুলো,...
এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী :: সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড—নিলাম্বরপুর। হাওর-বাঁওড়, খাল-নালা, গাছগাছালি আর সবুজ ধানক্ষেতের অপরূপ...
ছবি সংগৃহীত
এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী :: সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড—নিলাম্বরপুর। হাওর-বাঁওড়, খাল-নালা, গাছগাছালি আর সবুজ ধানক্ষেতের অপরূপ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ গ্রামটি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক শান্ত-স্নিগ্ধ ছবি। মাত্র একটি গ্রাম নিয়েই গঠিত এই ওয়ার্ডে আনুমানিক চার হাজার মানুষের বসবাস। গ্রামের ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫৭০ জন।
নিলাম্বরপুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর ভৌগোলিক সৌন্দর্য। গ্রামের প্রায় তিন দিকই হাওরবেষ্টিত। বর্ষায় হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর শীত-হেমন্তে সবুজ ধানক্ষেত—ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিলাম্বরপুরও যেন নতুন রূপ ধারণ করে। পুরো গ্রামটিকে বেষ্টনী দিয়ে রেখেছে এলজিইডির পাকা সড়ক। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ, সবুজ মাঠ, খাল-নালা ও বৃক্ষরাজির ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা বসতবাড়ি এ জনপদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত:
নিলাম্বরপুর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। গ্রামে রয়েছে চারটি মসজিদ, একটি সম্মিলিত গোরস্থান, একটি সম্মিলিত শাহী ঈদগাহ এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি আখড়া। হিন্দু-মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্ম, মত, শ্রেণী ও পেশার মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য এ গ্রামের অন্যতম বড় সম্পদ।
গ্রামের মানুষের আতিথেয়তা, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা যে কাউকে মুগ্ধ করবে। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে দীর্ঘদিন ধরে এখানে যে সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা নিলাম্বরপুরের গর্ব।
শিক্ষা বিস্তারে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রাম:
শিক্ষার ক্ষেত্রেও নিলাম্বরপুরের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। গ্রামে রয়েছে নিলাম্বরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসাতুল মদীনা বালাউট, বালাউট আল বারী ইবতেদায়ী মাদরাসা এবং হাজী আখলাক উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এলাকার শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে আসছে।
বিশেষ করে হাজী আখলাক উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা গেলে এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে মাদ্রাসাতুল মদীনা বালাউটকে আরও আধুনিক ও উন্নত করার জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণও জরুরি হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে একটি গভীর নলকূপ বরাদ্দের অনুমোদন পাওয়া গেছে—যা শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
অনুসন্ধানে দেখা যায় গ্রামেই রয়েছে বালাউট ডাকঘর: নিলাম্বরপুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো বালাউট ডাকঘর। গ্রামটির অভ্যন্তরেই ডাকঘর থাকায় স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ ও ডাকসেবার ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গ্রামের পেটের ভেতর ঢুকে গেছে ৯নং মানিকপুর ইউনিয়নের জারুলতলা গ্রাম। ফলে নিলাম্বরপুরের ভৌগোলিক বিন্যাসও বেশ বৈচিত্র্যময়। একদিকে হাওরের বিস্তৃতি, অন্যদিকে গাছপালা ও বসতবাড়ি—সব মিলিয়ে গ্রামটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
বিকেলের নিলাম্বরপুর—এক অন্যরকম অনুভূতি:
কোনো এক বিকেলে নিলাম্বরপুরের পথে হাঁটলে এর প্রকৃত সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। হাওর থেকে বয়ে আসা নির্মল বাতাস, ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু হাওয়া, পাখির ডাক, গাছের পাতার মর্মর শব্দ আর আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ—সবকিছু মিলে তৈরি হয় এক প্রশান্ত পরিবেশ।
বর্ষায় নৌকা, হাওরের পানি আর জলজ প্রকৃতি; আর শুষ্ক মৌসুমে সবুজ ফসলের মাঠ—নিলাম্বরপুর যেন সারা বছরই প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপের প্রদর্শনী।
উন্নয়নের জন্য কিছু প্রত্যাশা:
নিলাম্বরপুরবাসীর চাওয়া খুব বেশি নয়। স্থানীয় মানুষের প্রধান প্রত্যাশাগুলো মূলত যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক অবকাঠামোর উন্নয়নকে ঘিরে।
বিশেষ করে— নিলাম্বরপুর দক্ষিণ মাঝপাড়া জামে মসজিদের সামনে থেকে উত্তরমুখী শাহজার মোকাম পর্যন্ত রাস্তার প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট ও পাকাকরণ।
মসজিদের পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তরমুখী আব্দুন নূর মিয়ার বাড়ি হয়ে বালাউট (নিলাম্বরপুর) মধ্যপাড়া পুরাতন জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়ন।
প্রয়োজনীয় গার্ডওয়াল, মাটি ভরাট ও পাকাকরণের মাধ্যমে রাস্তাটি গ্রামের উত্তরের এলজিইডি পাকা সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
মধ্যপাড়া পুরাতন জামে মসজিদের উত্তরে প্রবাসী রাসেল আহমদের বাড়ির সামনে বিদ্যমান কালভার্টটি পুনর্নির্মাণ।
নিলাম্বরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেট বরাবর একটি নতুন কালভার্ট নির্মাণ।
নিলাম্বরপুর আখড়ার সামনের কালভার্ট পুনর্নির্মাণ এবং আখড়ার সার্বিক উন্নয়ন।
শাহী ঈদগাহর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন। হাজী আখলাক উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ।
নিলাম্বরপুর দক্ষিণ মাঝপাড়া জামে মসজিদ ও বালাউট (নিলাম্বরপুর) মধ্যপাড়া পুরাতন জামে মসজিদের উন্নয়ন। মাদ্রাসাতুল মদীনা বালাউটের আধুনিকায়ন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ। দক্ষিণ নিলাম্বরপুরের তেরাপুর-নয়াপাড়া এলাকার কয়েকটি বাড়ির মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে খাল খনন এবং খালের পাড়ে একটি উন্নত রাস্তা নির্মাণ। নিলাম্বরপুর গ্রামে বিশুদ্ধ পানির জন্য অন্তত ৩৫টি পরিবারের গভীর নলকূপ স্থাপন।
আখড়ার উন্নয়নে আশার আলো:
নিলাম্বরপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় আখড়ার উন্নয়নেও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা রয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ মুফতি আবুল হাসান এমপির পক্ষ থেকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উপাসনালয়ের উন্নয়ন ও পরিবেশগত সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উন্নয়ন হলে আরও সম্ভাবনাময় হবে নিলাম্বরপুর: নিলাম্বরপুরের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ ও প্রকৃতি। হাওরবেষ্টিত এই গ্রামটি যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ, তেমনি মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসাও এ গ্রামের অন্যতম পরিচয়।
যোগাযোগব্যবস্থার প্রয়োজনীয় উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন, কালভার্ট ও রাস্তা নির্মাণ, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন এবং দক্ষিণ নিলাম্বরপুরের মানুষের যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নিলাম্বরপুর আরও সমৃদ্ধ ও আদর্শ গ্রামে পরিণত হতে পারে।
নিলাম্বরপুর তাই শুধু একটি গ্রামের নাম নয়—এটি হাওরের বুকের এক টুকরো সবুজ সৌন্দর্য, সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ এবং উন্নয়নের অপার সম্ভাবনাময় একটি জনপদ।
প্রকৃতির নির্মল বাতাসে দাঁড়িয়ে, সবুজ ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে কিংবা গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে হাঁটলে যে প্রশান্তি অনুভূত হয়—সেটিই নিলাম্বরপুরের আসল পরিচয়। সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন যুক্ত হলে এই সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা আরও বহুগুণে বিকশিত হবে—এটাই নিলাম্বরপুরবাসীর প্রত্যাশা। এগুলোই বাস্তবায়িত হলে জকিগঞ্জ উপজেলা একটি মডেল হিসেবে রুপ ধারণ করবে।
এসএ/সিলেট