জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নের অপেক্ষায় এলাকাবাসী

post-title

এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী::  সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত ছোট্ট তিনটি গ্রামের মধ্যে বৃহৎ একটি গ্রাম গোটারগ্রাম। এ গ্রামে লোক সংখ্যা আনুমানিক ৩ হাজার ৩০০ জন। ভোটার রয়েছেন প্রায় ১৩৫০ জন। আয়তন ও পরিচিতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ গ্রামেই অবস্থিত ৩নং কাজলসার ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথের কারণে গোটারগ্রামের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। তবে সম্ভাবনাময় এই গ্রামটি এখনো যোগাযোগসহ বিভিন্ন মৌলিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে অনেকটা পিছিয়ে।

গোটারগ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে গ্রামটিকে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম—এই তিন ভাগে বিভক্ত করে থাকেন। গোটারগ্রাম উত্তর ও গোটারগ্রাম দক্ষিণ কাছাকাছি এবং প্রায় একসঙ্গে হলেও গোটারগ্রাম পশ্চিম মূলগ্রাম থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত গোটারগ্রাম ত্রিমোহনী পয়েন্ট হওয়ায় গোটারগ্রাম নামটি আশপাশের মানুষের কাছেও বেশ পরিচিত।

গোটারগ্রামের পশ্চিম অংশে অবস্থিত চৌধুরী বাজার এবং ৩নং কাজলসার ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের অবস্থানও এ গ্রামকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। চৌধুরী বাজারে রয়েছে চৌধুরী বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

গ্রামের পশ্চিম সীমানাজুড়ে রয়েছে কুলনদী। নদীর একটি অংশ সরকারিভাবে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে রয়েছে। নদীর তীর ঘেঁষে সবুজ বৃক্ষরাজি, জলাভূমি ও গ্রামীণ পরিবেশ গোটারগ্রামকে দিয়েছে অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

কুলনদীর তীরে গোটারগ্রামসহ তিনটি গ্রামের সম্মিলিত একটি মসজিদ রয়েছে। গ্রামের পশ্চিম অংশে রয়েছে নানা অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত পাঁচ পীরের মোকাম। মোকাম বা মাজারের পূর্ব পাশেই রয়েছে একটি হাফিজিয়া ও নূরানী মাদ্রাসা।

দিঘি ও ধর্মীয় স্থাপনার সমৃদ্ধি

গোটারগ্রামের দক্ষিণে রয়েছে একসময় নানা অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হিসেবে পরিচিত একটি বিশাল দিঘি। দিঘির দক্ষিণ ও পশ্চিম কোণে রয়েছে গোটারগ্রাম পশ্চিম পুরাতন জামে মসজিদ নামে একটি ছোট্ট ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ।

গোটারগ্রামের নামে সরকারি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও এখানে রয়েছে গোটারগ্রাম ইয়াকুবিয়া দাখিল মাদ্রাসা, যা মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসার উত্তর পাশেই রয়েছে একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ। এছাড়া গোটারগ্রামের আমেরিকা প্রবাসী আব্দুল মতিনের বাড়িতেও রয়েছে একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ। মরহুম তাহির আলী মেম্বার সাহেবের বাড়ির পাশেও রয়েছে একটি জামে মসজিদ।

তবে ‘গোটারগ্রাম মসজিদ’ বললেই স্থানীয় মানুষের কাছে যে মসজিদটি পরিচিত, সেটি হলো গোটারগ্রাম ত্রিমোহনী পয়েন্টের সঙ্গে অবস্থিত মসজিদটি। মসজিদের সামনেই রয়েছে একটি গোরস্থান। গোটারগ্রামের দক্ষিণ অংশেও রয়েছে আরেকটি গোরস্থান। তবে সবচেয়ে আলোচিত ও পরিচিত গোরস্থান হচ্ছে পাঁচ পীরের মোকাম।

চারদিকে প্রকৃতি, মাঝখানে সম্ভাবনার জনপদ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গোটারগ্রামের পূর্বে আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়ক, পশ্চিমে কুলনদী, উত্তরে গোটারগ্রাম-চৌধুরী বাজার এলজিইডি সড়ক এবং দক্ষিণে রয়েছে একটি কাঁচা সড়ক। দক্ষিণের এ কাঁচা সড়কটি গোটারগ্রাম ও পলাশপুর—দুটি গ্রামকে বিভক্ত করেছে।

কুলনদীর শান্ত জল, সবুজ গাছপালা, বিশাল দিঘি, ধর্মীয় স্থাপনা ও গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য গোটারগ্রামকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এ সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যোগাযোগ সমস্যাই বড় চ্যালেঞ্জ:
ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রামের মতো গোটারগ্রামেও রয়েছে যোগাযোগ সমস্যা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কাঁচা ও অপর্যাপ্ত সড়কগুলো মানুষের চলাচলকে কঠিন করে তোলে। এতে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। হালকা বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কৃষিপণ্য পরিবহনেও তৈরি হয় বাড়তি সমস্যা।

তবে গ্রামের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন করা গেলে শুধু গোটারগ্রাম নয়, আশপাশের একাধিক গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

যেসব সড়কের উন্নয়ন জরুরি:
আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়ক থেকে তাহির আলী মেম্বারের বাড়ি হয়ে মোস্তাক আহমদের বাড়ির পশ্চিম পর্যন্ত:
গোটারগ্রামের দক্ষিণ অংশে আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়ক থেকে মরহুম তাহির আলী মেম্বারের বাড়ি হয়ে সামনে দিয়ে আমেরিকা প্রবাসী মোস্তাক আহমদের বাড়ির পশ্চিম পর্যন্ত রাস্তাটি সিসি ঢালাই কিংবা ইটসলিং করা প্রয়োজন।
গ্রামের একেবারে দক্ষিণ সীমানায় আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়ক থেকে পশ্চিমমুখী রাস্তায় এবাদ মেম্বারের বাড়ির সামনের কালভার্ট থেকে পলাশপুর গ্রামের আইয়ুব আলীর বাড়ির উত্তর পর্যন্ত সিসি ঢালাই কিংবা ইটসলিং প্রয়োজন।
এই দুটি কাজ কাবিখা কিংবা এডিপির বরাদ্দ থেকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে স্থানীয়ভাবে মনে করা হচ্ছে।

আজাদ মিয়ার বাড়ি থেকে পলাশপুর:
গোটারগ্রাম-চৌধুরী বাজার সড়কের আজাদ মিয়ার বাড়ির পশ্চিম থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে পলাশপুর পর্যন্ত সড়কটি পাকাকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ একটি সড়ক পাকাকরণ করা হলেও শুধু দুই-তিনটি গ্রামের নয়, বরং তিনটি ওয়ার্ডের মানুষের চলাচল ও কৃষি উন্নয়নে ব্যাপক উপকার হবে।

গোটারগ্রামের পশ্চিমে চৌধুরী বাজার থেকে দক্ষিণমূখী কুলনদীর পূর্বপাড় দিয়ে সরকারি আইডিভুক্ত রাস্তাটি বালাউট পর্যন্ত পাকাকরণ করা গেলে গোটারগ্রামের যোগাযোগ সমস্যার মূল চিত্রই পাল্টে যেতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম গোটারগ্রামের মানুষের জন্য এটি হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ।

কুলনদীর পূর্বপাড় থেকে আব্দুস সালাম মেম্বারের বাড়ি ভায়া জবু মিয়া ও মছনু মিয়ার বাড়ি হয়ে নজরুল ইসলামের বাড়ির সামনের গোটারগ্রাম-চৌধুরী বাজার রাস্তা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থানে আংশিক মাটি ভরাট করে সিসি ঢালাই কিংবা ইটসলিং করা প্রয়োজন।

কুলনদীর পূর্বপাড় থেকে পাঁচ পীরের মোকাম ও মাদ্রাসা ভায়া চৌধুরী বাজার-গোটারগ্রাম এলজিইডি সড়ক পর্যন্ত সিসি ঢালাই কিংবা ইটসলিং করা গেলে পশ্চিম গোটারগ্রামের মানুষের যোগাযোগ সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।

উন্নয়ন দরকার মসজিদ-মাদ্রাসা, গোরস্থান ও ক্লিনিকেও
গোটারগ্রামের সমস্যা শুধু সড়ক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান ও কমিউনিটি ক্লিনিকের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজও জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে গ্রামের মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে।
বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির জন্য গোটারগ্রামে অন্তত ২৭টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

উন্নয়ন হলে বদলে যাবে গোটারগ্রামের চিত্র:
প্রশাসনিক গুরুত্ব, চৌধুরী বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কুলনদী, সরকারি মৎস্য অভয়াশ্রম, ঐতিহ্যবাহী পাঁচ পীরের মোকাম, বিশাল দিঘি এবং সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক পরিবেশ—সব মিলিয়ে গোটারগ্রামের রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা।
প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত উন্নয়ন। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পাকাকরণ, অভ্যন্তরীণ রাস্তায় সিসি ঢালাই বা ইটসলিং, মাটি ভরাট, মসজিদ-মাদ্রাসা ও গোরস্থানের উন্নয়ন, কমিউনিটি ক্লিনিকের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা গেলে গোটারগ্রাম হয়ে উঠতে পারে কুলনদীর তীরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা একটি আদর্শ গ্রাম।

আজ গোটারগ্রামের পথে পথে যেমন রয়েছে সবুজ প্রকৃতির হাতছানি, তেমনি রয়েছে উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে যোগাযোগসহ মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা গেলে এই সম্ভাবনাময় জনপদটি শুধু পরিচিত একটি গ্রাম নয়—উন্নত, সুন্দর ও আদর্শ গ্রামীণ জনপদ হিসেবে নতুন পরিচয় পেতে পারে। এজন্যই জকিগঞ্জ কানাইঘাটের মাননীয় সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান সহ সংশ্লিষ্ট সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করা হয়েছে।

এসএ/সিলেট