রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

কানাইঘাটে সরকারি জলমহাল উদ্ধারে ডিসি ও আদালতের শরণাপন্ন হলেন এলাকাবাসী

post-title

ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের কানাইঘাটে সরকারি জলমহাল বাদিকুঁড়ি বিল (বদিবিল) প্রভাবশালীদের দখল হতে উদ্ধার করার জন্য সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হলেন এলাকাবাসী। কিন্তু এরপরও জলমহালটি দখলমুক্ত হচ্ছেনা। এতে ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে।

এজাহার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার ৯ নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ফতেহগঞ্জ হাওর মৌজার ৮৭ নং জে.এল এ অবস্থিত সরকারের খাস জলমহাল বাদিকুঁড়ি বিল (বদিবিল)। এর ভ‚মির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮৩ একর অর্থাৎ কম-বেশি বারো বিঘা জমি রয়েছে। বর্ষার মৌসুমে বিলের পাশ^বর্তী ব্যক্তি মালিকানাধীন ফসলী ভ‚মি পানিতে তলিয়ে গেলে বিল ও ফসলী ভ‚মি একাকার হয়ে যায়। স্থানীয় মীর্জারগড় মৌজার মৃত আহসান মিয়ার পুত্র আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল (৪৮) ও তার আপন ছোট ভাই মহানগর যুবলীগ নেতা রুহেল আহমদ মুরাদ (৪৬) গংরা এই জলমহালটি দীর্ঘদিন ধরে দখলে রেখেছে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন বেশ কয়েকবার ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কিন্তু ওই প্রভাবশালী মহলের বাধারমুখে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০১১ ইং সনে স্থানীয় নিজ রাজাগঞ্জের মৎস্য ব্যবসায়ী মদরিছ আলী সরকারের ইজারার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাছ ধরতে বিলে যান। তখন সুহেল ও রুহেল গংরা তাকে বাধা দেয়। তিনি শত চেষ্টা করেও বিল দখলে নিতে পারেননি। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে বিল থেকে ফেরৎ আসেন। এরপর আর কেউ এই বিলের ধারেপাশে যেতে পারেননি। এভাবেই দখলে রেখেছে প্রভাবশালী এই মহল।

এ ঘটনায় স্থানীয় মইনার পাহাড় মৌজার মো. আব্দুল মুহিত বাদী হয়ে এলাকাবাসীর পক্ষে ২০২৫ ইং সনের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। যার নং-৯৩/২০২৫। একই ঘটনায় স্থানীয় মৃত হাজী রইছ মিয়ার পুত্র মো. তাজুল ইসলাম ও আব্দুল হাইর পুত্র আব্দুল কুদ্দুছ সহ ৩ শতাধিক লোকের স্বাক্ষরিত আরেকটি অভিযোগ সিলেটের জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার ও কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে দায়ের করা হয়। 

স্থানীয় মইনার পাহাড় মৌজার মো. আব্দুল মুহিত জানান, বাদিকুঁড়ি বিলের পাশে ছোট লামাইশ ও বড় লামাইশ জলমহাল রয়েছে। খাস ওই জলমহালগুলোর পাশে আমাদের পরিবারের ৯ বিঘা সহ এলাকার ব্যক্তি মালিকানাধীন শতাধিক বিঘা ফসলী জমি রয়েছে। বর্ষার মৌসুমে বিলের পানিতে তলিয়ে যায় এসব ফসলী জমি। তখন বিল ও ফসলী জমি একাকার হয়ে যায়। এসময় জীবিকার তাকিদে স্থানীয় মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের লোক বা দরিদ্র লোকজন মাছ ধরার চেষ্টা করলে সুহেল গংরা তাদেরকে বাধা দেয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে একটি মামলাও হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও ভ‚মি অফিসের তহশিলদার সরেজমিন তদন্ত করেছেন। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসন বিলটিতে ১৪৪ ধারাও জারী করেছিল। এরপরও বিলটির দখল ছাড়েনি সুহেল গংরা।

আব্দুল মুহিত আরও জানান, প্রতিবছর আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল ও তার আপন ছোট ভাই মহানগর যুবলীগ নেতা রুহেল আহমদ মুরাদ গংরা জলমহালটির মাছ নিজেরা দাম হাকিয়ে বিক্রি করে থাকেন। এ বছরও ১৮ লাখ টাকা দাম হাকিয়ে নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর আগে গেলো বছর ১৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকায় ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। বারো বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে মাছ বিক্রির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে।

স্থানীয় বিএনপি নেতা কামাল আহমদ বলেন, জোরপূর্বকভাবে সরকারের সম্পদ দখলে রাখা সম্পূর্ণ অন্যায় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে, জলমহালটির পাশেই রয়েছে মইনার পাহাড় মৌজার জেলেপাড়া। এখানে মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের ৪০-৪৫ পরিবারের বসতি। জেলেপাড়ার আরব উল্লাহ ও ইসলাম উদ্দিন সহ অন্তত ১৫-২০ জন মৎস্যজীবি জানান, হাওরে সরকারের খাস জলমহালে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাধায় জাল ফেলতে পারেন না। মাছ ধরতে গেলে তাদেরকে  মারধর করা হয়। যার কারণে অনেক কষ্টে তাদেরকে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।

এদিকে, অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল ও রুহেল আহমদ মুরাদ গংরা। তারা বলেন, এই বিলের আয়ের টাকা একক কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের পকেটে ঢুকছেনা। মীর্জার গড় ও ফতেহগঞ্জ হাওর মৌজার ৬টি গ্রামের উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে। 

তারা আরও বলেন, বিল নিয়ে আইনী লড়াই চলছে। এলাকাবাসীর পক্ষে আশরাফ সিদ্দিকী সুহেল নিজে বাদী হয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রীট করেছেন বলে জানান। 

এ ব্যাপারে কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান শাকিল বলেন, টাকা ভাগ-বাটোয়ারার কোন তথ্য পাইনি। আর বিলটির সার্বিক বিষয় ফাইল না দেখে বলা যাচ্ছেনা। কাগজপত্র দেখে খোঁজ নিচ্ছি।


কাওছার আহমদ