সিলেটে সাত উপজেলার মানুষ পানিবন্দি : নগরে জলাবদ্ধতা

post-title

ছবি সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায়। বিশেষ করে সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জের অনেক এলাকা এখন বন্যাকবলিত। বন্যায় এসব উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলা শহরেও প্রবেশ করেছে পানি।

এদিকে, সিলেট মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নগরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সুরমা নদীর পানি বেড়ে এ জলাবব্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।


ছবিটি নগরীর ৩৫নং ওয়ার্ডের ইসলামপুর বাজার থেকে তোলা


বৃহস্পতিবার (৩০ মে) রাত ৯টার পর থেকে মহানগরের তালতলা, মেন্দিবাগ, মাছিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে সড়কে পানি উঠতে শুরু করে। শুক্রবার (৩১ মে) সকালে তালতলা ও মেন্দিবাগ-মাছিমপুর সড়কে সড়ক দুটিতে প্রায় হাঁটু পানি জমে গেছে।

এদিকে, সুরমা নদীর বেশ কিছু এলাকায় পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। কুশিয়ারা নদীর ১০ স্থানে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বিয়ানীবাজারের গ্রামের পর গ্রাম। এ ছাড়া সারি ও বড়গাঁও নদী উপচে পানি ঢুকতে শুরু করেছে লোকালয়ে। এরই মধ্যে বন্যায় সিলেটের অন্তত ছয় উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫ লাখ মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুর্গতদের জন্য খোলা হয়েছে ৪৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র।

জৈন্তাপুরের সারি-গোয়াইনঘাট সড়কের বড়হাল গ্রামের বাসিন্দা এমরান আহমদ বন্যার কারণে গত দু’দিন ধরে ঘরে মাচা বেঁধে বসবাস করছেন। একই গ্রামের সাইফুল ইসলাম তাঁর ঘরে খাটের ওপর খাট তুলে পরিবার নিয়ে পার করেছেন গত দুই রাত। তারা বলছেন, পানি আরও বাড়লে তাদের সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হবে। গতকাল সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে বন্যার এমন চিত্র দেখা যায়। একই সড়কের উভয় পাশের নয়াগ্রাম উত্তর, লাফনাউট, খলাগ্রামে প্রবেশ করে দেখা যায়, কেউ ঘর থেকে পানি বের করছেন, কেউবা চেষ্টা করছেন পানি আটকাতে। সব মিলে জৈন্তাপুর উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের মানুষ এখন নিজেদের রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত।

গতকাল বিকেলে জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি সারিঘাট থেকে নৌকায় গোয়াইনঘাটের পূর্ব আলীরগাঁও, পশ্চিম আলীরগাঁও ও সদর এলাকা পরিদর্শনে যান। পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের লাফনাউটে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন। গোয়াইনঘাট উপজেলার ৭০ ভাগ মানুষ এখন পানিবন্দি। তাদের উদ্ধারে জাফলং পর্যটক ঘাটের দেড় শতাধিক নৌকা এবং প্রতিটি ইউনিয়নের স্থানীয় নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে। সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।

সারি-গোয়াইনঘাট সড়কের নয়াগ্রাম উত্তর এলাকায় রাস্তার ওপর দিয়েও বন্যার পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। একই রাস্তার বড়গাঁও এলাকা হাঁটুপানিতে ডুবে থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ। জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মুক্তাপুর এলাকায় অনেকে মাচা বেঁধে তার ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। মুক্তাপুরের রহিম উদ্দিন জানান, বুধবার রাতে কিছুটা পানি কমলেও ঘর থেকে নামেনি।

এদিকে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মৎস্য খামার ভেসে গেছে। গরু-মহিষ নিয়ে রাস্তায় অবস্থান করছেন কৃষকরা। জৈন্তা ও গোয়াইনঘাটের প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি আছেন বলে জানিয়েছেন নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী। তিনি জানান, বন্যার্তদের পাশে তারা রয়েছেন।
আরেক উপজেলা বিয়ানীবাজারে কুশিয়ারা নদীর ১০টি অংশের বাঁধ ভেঙে উপজেলার দুবাগ ও শেওলা ইউনিয়নের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকার লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ। ইউএনও কাজী শামীম বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
বুধবার রাতেই সুরমা-কুশিয়ারা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রিত বাঁধ ভেঙে জকিগঞ্জের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হঠাৎ এই বন্যার কারণে আগামী ৫ জুন জকিগঞ্জে উপজেলা নির্বাচন হওয়া নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানায়, মোট খোলা ৪৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে গোয়াইনঘাটে ৫৬, জৈন্তাপুরে ৪৮, কানাইঘাটে ১৮, কোম্পানীগঞ্জে ৩৫ ও জকিগঞ্জে ৫৮টি। কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে এরই মধ্যে লোকজন উঠেছে। ত্রাণ পর্যাপ্ত রয়েছে। বন্যার কারণে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর আবাদি জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যাদুর্গত পরিবারের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯০০টি এবং মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫০। যদিও বন্যাকবলিত মানুষ ৫ লাখ হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলার জনপ্রতিনিধিরা।

জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানান, বন্যার্তদের জন্য আপাতত ২০০ বস্তা করে মোট ১ হাজার বস্তা শুকনো খাবার, ৭৫ টন চাল ও আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণের সমস্যা হবে না।

এসএ/সিলেট