আগাম বৃষ্টি ও ঢলে ডুবেছে হাওরে বোরোর সর্বনাশ

post-title

ছবি সংগৃহিত

সুনামগঞ্জের হাওরে সবুজ ধানের শিষ লালচে হতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। সপ্তাহখানেক পরই হাওরে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা। এ অবস্থায় কৃষকদের মুখে হাসি থাকার কথা, কিন্তু এর বদলে হাওরে শ্রমে-ঘামে ফলানো সোনার ধান নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তারা। এর কারণ বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢল। ইতিমধ্যে বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কোনো কোনো হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নিমজ্জিত হয়েছে বেশ কিছু ধানখেত।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় এ পর্যন্ত ১৩০ হেক্টর জমির বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে। আর বৃষ্টি না হলেও বেশি ক্ষতি হবে না। তবে কৃষকেরা বলেছেন, নিমজ্জিত জমির পরিমাণ আরও বেশি। অনেক কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সোমবার বিকেলে জেলার দেখার হাওরে জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার। তাঁরা জলাবদ্ধ হাওরের পানিনিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসক বলেছেন, ‘বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদীতে পানি কিছুটা বাড়লেও বিপৎসীমার অনেক নিচে আছে। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছি। কৃষকেরা দেখার হাওরের পানিনিষ্কাশনের জন্য যে স্থানটির কথা বলেছেন, আমরা সেটি দেখে ব্যবস্থা নেব। হাওরের ফসল কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে গোলায় তুলতে পারেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করা হবে।’
হাওরপাড়ের কৃষকেরা জানান, সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে গত কয়েক দিন ঝড়বৃষ্টি হয়েছে, সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও ছিল। এ রকম বিরূপ আবহাওয়ায় হাওরের বোরো ধান নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। হাওর ও নদীতে পানি বাড়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নিমজ্জিত কাঁচা, কোথাও আধা পাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন অনেকে।
কৃষকেরা জানান, এ সময় হাওর এলাকায় বৃষ্টি, ভারী বৃষ্টি, উজানের পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যার শঙ্কা থাকে। যদি এসবের কোনো একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওরে হয়, তাহলে কৃষকের সর্বনাশ হয়ে যায়।
সোমবার বিকেলে জেলার দেখার হাওরের সদর উপজেলার ইছাগড়ি গ্রামের দক্ষিণ পাশে গিয়ে দেখা যায়, হাওরের অনেক জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষকেরা পানিতে নেমে সেই ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ গোখাদ্যের জন্য কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন।
হাওরপাড়ের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক লুৎফুর রহমান জানান, তার ২৬ বিঘা জমির ধান তলিয়েছে। এই জমির ধানেই সংসারের পুরো এক বছরের খাবারসহ সব খরচ চলে। জমি রোপণ করতে ব্যয় করেছেন ৪০ হাজার টাকা। ধারদেনা আছে। লুৎফুর রহমান বলেন, ‘আমার সব শেষ। কী করব, বুঝতে পারছি না। এই কাঁচা ধান কেটে তো কোনো লাভ হবে না।’
ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক ইছবর আলী বলেন, তিনি ছয় বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছিলেন। সব জমিই পানিতে তলিয়ে গেছে। কাঁচা ধান গরুর খাবারের জন্য এখন কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইছাগড়ি গ্রামের বাসিন্দা মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য হাবিবুর রহমান জানান, দেখার হাওরে চারটি উপজেলার কৃষকদের জমি আছে। এটি জেলার সবচেয়ে বড় ধানের হাওর। এই হাওরের পানি শান্তিগঞ্জ উপজেলার মহাসিং নদে গিয়ে পড়ে। কিন্তু হাওরের ফসল রক্ষার জন্য ভাটিতে বাঁধ থাকায় পানি নামতে না পারায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
স্থানীয় কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলাবদ্ধতার বিষয়টি সবাই জানেন। ভাটির বাঁধ কেটে দিলেই পানিনিষ্কাশন হবে। কিন্তু আগাম বন্যা হলে তখন ওই বাঁধের কেটে দেওয়া অংশের কারণে পুরো হাওরের ফসল ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তারা এই ঝুঁকি না নিয়ে অন্য কোনোভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় কি না, চিন্তা করছেন।
শুধু দেখার হাওর নয়, সদর উপজেলার কানলার হাওরেও একইভাবে বৃষ্টি ও উজানের ঢলের পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় বেশ কিছু জমি নিমজ্জিত হয়েছে। এই হাওর একেবারে মেঘালয় পাহাড়ের কাছাকাছি। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে সহজেই হাওরে পানি চলে আসে। কৃষি বিভাগ বলছে, এই হাওরে নিমজ্জিত জমির পরিমাণ ৭০ হেক্টর।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৭০ হাজার ২০০ টন। হাওর এলাকার কৃষকেরা নির্বিঘ্নে এই ধান গোলায় তুলতে পারলে ৪ হাজার ১১০ কোটি টাকার ধান উৎপাদন হবে সুনামগঞ্জে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, ‘এবার সুনামগঞ্জে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে বোরো রোপণ হয়েছে। আমরা সব হাওরেই খোঁজ রাখছি। যাঁদের ক্ষতি হবে, তাঁদের সহায়তার চেষ্টা করা হবে। তবে পানি কমে গেলে ক্ষতি কম হবে।’
সুনামগঞ্জে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে বিস্তীর্ণ হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতিবছর প্রশাসন ও পাউবো ৪০টি হাওরে ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ করে। এবার জেলার ১২টি উপজেলায় ৭৩৫টি প্রকল্পে ৫৯১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে। এতে প্রাক্কলন ধরা আছে ১৩০ কোটি টাকা। ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে সব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। পরে সময় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী ও হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণসংক্রান্ত জেলা কমিটির সদস্যসচিব মো. মামুন হাওলাদার বলেন, এখন অবশ্য ভারী বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস নেই। সুনামগঞ্জে ও উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।

SI/04/100424